যেভাবে ছাত্রলীগ মুক্ত হয়েছিল ঢাবির হলগুলো: ফিরে দেখা ১৫ জুলাইয়ের রক্তক্ষয়ী দিন
ঢাকা — দিকবিদিক ছোটাছুটি, রক্ত, অসহায়ত্ব আর অপমান! ২০২৪ সালের ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এমন এক বীভৎসতার সাক্ষী হয়েছিল, যা শতবর্ষের এই বিদ্যাপীঠ আগে কখনো প্রত্যক্ষ করেনি। ১৪ জুলাই রাতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর ‘রাজাকার’ ট্যাগিংয়ের প্রতিবাদে ফুঁসে ওঠা রাজপথ পরদিন পরিণত হয়েছিল এক নারকীয় যুদ্ধক্ষেত্রে। কিন্তু এই রক্তক্ষয়ী দিনটিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো থেকে ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের আধিপত্যের চূড়ান্ত পতন ঘটিয়েছিল।
নারী শিক্ষার্থীদের ওপর পৈশাচিক হামলা ১৫ জুলাই দুপুরে দুই পক্ষের কর্মসূচি ঘিরে হট্টগোল শুরু হয়। খবর আসে বিভিন্ন হলে আন্দোলনের পক্ষের শিক্ষার্থীদের আটকে রাখা হয়েছে। তাদের ছাড়াতে গেলেই শুরু হয় ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও লাঠির লড়াই। তবে সবচেয়ে নক্কারজনক ঘটনাটি ঘটে ভিসি চত্বর, মল চত্বর ও হলপাড়ায়। বহিরাগত ‘টোকাই’ ও মহানগর ছাত্রলীগের ক্যাডাররা নারী শিক্ষার্থীদের ওপরও পৈশাচিক হামলা চালায়।
সেদিনের হামলায় আহত সলিমুল্লাহ মুসলিম (এসএম) হলের শিক্ষার্থী রায়হান জানান, নারী শিক্ষার্থীদের বাঁচাতে গিয়েই তিনি বেশি আক্রমণের শিকার হন। তার মাথায় ৯টি সেলাই দিতে হয়েছিল।
হামলার ভয়াবহতা বর্ণনা করতে গিয়ে আহত নারী শিক্ষার্থী সঞ্জিদা তোর বলেন, "ওরা আমাদের লক্ষ্য করে ইট ছুড়ছিল। একটা ইট এসে আমার চোখের নিচে লাগে, চশমার কাঁচ ভেঙে গভীর ক্ষত হয়ে যায়। আমার সামনেই দুটো মেয়েকে ওরা লাঠি দিয়ে মারছিল আর জিজ্ঞেস করছিল—‘আর কোনোদিন আন্দোলনে আসবি? আর কোনোদিন আসবি?’ সেদিন মনে হচ্ছিল এটাই হয়তো আমাদের জীবনের শেষ দিন।"
শহীদুল্লাহ হল থেকে শুরু প্রতিরোধ: ধসে পড়ে ছাত্রলীগের দুর্গ উত্তরপাড়ার হলগুলোতে ছাত্রলীগের এই সশস্ত্র ও বর্বরোচিত হামলার পর প্রথম শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হলের শিক্ষার্থীরা। হল গেটে ছাত্রলীগের নেতাকর্মী ও বহিরাগতদের সাথে সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রায় চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা তীব্র সংঘর্ষ চলে।
অকুতোভয় প্রতিরোধের মুখে একপর্যায়ে ছাত্রলীগ পিছু হটতে বাধ্য হয় এবং আন্দোলনকারীরা পুরো হলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেন। এই শহীদুল্লাহ হল থেকেই প্রথম ছাত্রলীগকে বিতারিত করা হয়। এই বিজয়ের খবর ছড়িয়ে পড়লে অন্যান্য হলের সাধারণ শিক্ষার্থীরাও ঐক্যবদ্ধ হয়ে ওঠেন এবং ছাত্রলীগের নেতাদের রুম ভেঙে তাদের হল থেকে বের করে দেন।
হাসপাতালে নারকীয় হামলা ও পদত্যাগের হিড়িক ক্যাম্পাসের বাইরেও সেদিন রক্তের হোলিখেলা মেতেছিল ছাত্রলীগ। আহত শিক্ষার্থীরা যখন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে যান, তখন সেখানেও তাদের ওপর পুনরায় হামলা চালানো হয়। এমনকি যেসব চিকিৎসক তাদের চিকিৎসা দিচ্ছিলেন, তাদের ওপরও চড়াও হয় সন্ত্রাসীরা। এক শিক্ষার্থী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকাতেও হাসপাতালে রোগীদের ওপর হামলা হয় না, কিন্তু ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা ঢাকা মেডিকেলে সেই নজিরবিহীন ঘটনা ঘটিয়েছে।"
ছাত্রলীগের এমন পৈশাচিকতা দেখে খোদ সংগঠনের ভেতরেই তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। অনেক নেতাকর্মী সেদিনই ছাত্রলীগ থেকে পদত্যাগ করে সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে যোগ দেন।
উপসংহার ১৫ জুলাইয়ের এই নারকীয় হামলা ও তার বিপরীতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের অবিচল প্রতিরোধ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। বুলেটের ভয় আর লাঠির আঘাত তুচ্ছ করে সেদিন শহীদুল্লাহ হলের গেট থেকে যে প্রতিরোধের আগুন জ্বলেছিল, তা-ই মূলত পুরো ক্যাম্পাসে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মুক্তির পথ প্রশস্ত করেছিল।
Comments (0)
Login to leave a comment.
No comments yet. Be the first to comment.
Related posts
জুলাই আন্দোলন
‘রাতে রাজাকার তকমা, দুপুরে রক্তপাত’: ১৫ জুলাইয়ের সেই দুঃসহ স্মৃতি এবং ছাত্র আন্দোলন থেকে গণ-আন্দোলনে রূপ নেওয়ার ইতিহাস
জুলাই আন্দোলন
কাউকে দেখামাত্র গুলি করা হবে’: ২০ জুলাইয়ের কঠোর কারফিউ এবং বুলেটের ভয়কে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তারুণ্যের সেই রাজপথ দখল
জুলাই আন্দোলন