টিয়ারশেলের ধোঁয়া ও ‘ভুয়া ভুয়া’ স্লোগান: ১১ জুলাই যেভাবে রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়
কুমিল্লা — "আমার যে ফ্রেন্ড, আমার যে সাংবাদিক, তার যে মাথা ফাটল... আপনারা যে মাথা ফাটাইলেন, তার ব্যবস্থা কী নেবেন আপনারা বলেন?"
হাতে প্রেস কার্ড, চোখেমুখে তীব্র ক্ষোভ। পুলিশের রায়ট গিয়ার আর সাঁজোয়া যানের সামনে দাঁড়িয়ে এভাবেই এক অকুতোভয় সাংবাদিক সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিলেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এক কর্মকর্তাকে। ২০২৪ সালের ১১ জুলাই, কোটা সংস্কার আন্দোলনে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় (কুবি) ক্যাম্পাসে এমনই এক নজিরবিহীন ও উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল।
শিক্ষার্থীদের জমায়েত ও পুলিশের অতর্কিত হামলা প্রতিদিনের বাংলাদেশের (Protidiner Bangladesh) ধারণ করা ফুটেজ থেকে দেখা যায়, ১১ জুলাই কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তাদের যৌক্তিক দাবি নিয়ে ক্যাম্পাসে জড়ো হয়েছিলেন। কিন্তু আন্দোলন দমাতে পুলিশ সেখানে কঠোর অবস্থান নেয়। শিক্ষার্থীদের বিশাল মিছিল যখন সামনের দিকে এগোতে চায়, তখন পুলিশ তাদের পথ রোধ করে।
শিক্ষার্থীরা ব্যারিকেড ভেঙে এগোতে চাইলে শুরু হয় পুলিশের সাথে ধস্তাধস্তি। এ সময় শিক্ষার্থীরা আকাশভেদী "ভুয়া, ভুয়া" এবং "অ্যাকশন, ডাইরেক্ট অ্যাকশন" স্লোগানে চারপাশ প্রকম্পিত করে তোলেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ একপর্যায়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর লাঠিচার্জ শুরু করে।
সাংবাদিকদের ওপর পুলিশের বর্বরোচিত হামলা সেদিন পুলিশের লাঠিচার্জ থেকে রেহাই পাননি পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে যাওয়া সাংবাদিকরাও। পুলিশের বেধড়ক পিটুনিতে এক সাংবাদিকের মাথা ফেটে যায়। এই ঘটনার পর উপস্থিত অন্য সাংবাদিকরা ক্ষোভে ফেটে পড়েন।
ফুটেজে দেখা যায়, এক সাংবাদিক নিজের গলার প্রেস কার্ড পুলিশের চোখের সামনে তুলে ধরে তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। তিনি বারবার প্রশ্ন করতে থাকেন, "কেন আপনারা বিনা উসকানিতে সাংবাদিকের গায়ে হাত তুললেন? এর বিচার কে করবে?" পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তাকে শান্ত করার চেষ্টা করলেও, সাংবাদিকদের যৌক্তিক ক্ষোভের সামনে তারা কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।
মুহুর্মুহু টিয়ারশেল ও রণক্ষেত্র ক্যাম্পাস পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠলে শিক্ষার্থীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ বৃষ্টির মতো টিয়ারশেল নিক্ষেপ করতে শুরু করে। মুহুর্মুহু সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ারগ্যাসের বিষাক্ত ধোঁয়ায় পুরো ক্যাম্পাস মুহূর্তেই একটি রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। দিকবিদিক ছুটতে শুরু করেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। তবে পুলিশের এত অ্যাকশনের পরও শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দমানো যায়নি, বরং এই হামলা তাদের ক্ষোভের আগুনে আরও ঘি ঢেলে দেয়।
উপসংহার ১১ জুলাই কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ঘটনা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছিল যে, স্বৈরাচারী ব্যবস্থার আইনশৃঙ্খলা বাহিনী শুধু সাধারণ শিক্ষার্থীদেরই নয়, সত্য প্রকাশের কারিগর সাংবাদিকদেরও কীভাবে নির্মমভাবে দমন করার চেষ্টা করেছে। পুলিশের লাঠির সামনে সেদিন কুবির সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীদের সেই অকুতোভয় অবস্থান জুলাই বিপ্লবের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
Comments (0)
Login to leave a comment.
No comments yet. Be the first to comment.
Related posts
জুলাই আন্দোলন
‘রাতে রাজাকার তকমা, দুপুরে রক্তপাত’: ১৫ জুলাইয়ের সেই দুঃসহ স্মৃতি এবং ছাত্র আন্দোলন থেকে গণ-আন্দোলনে রূপ নেওয়ার ইতিহাস
জুলাই আন্দোলন
কাউকে দেখামাত্র গুলি করা হবে’: ২০ জুলাইয়ের কঠোর কারফিউ এবং বুলেটের ভয়কে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তারুণ্যের সেই রাজপথ দখল
জুলাই আন্দোলন