শাহ আমানত সেতুতে মুহুর্মুহু টিয়ারশেল: ১৮ জুলাই যেভাবে রণক্ষেত্র হলো চট্টগ্রামের রাজপথ
চট্টগ্রাম — ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে সারা দেশে চলছে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ বা সর্বাত্মক অবরোধ কর্মসূচি। এর ঠিক দুদিন আগে (১৬ জুলাই) চট্টগ্রামের মুরাদপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে শিক্ষার্থীদের ওপর গুলি ও নির্মম হত্যার প্রতিবাদে ক্ষোভে ফুঁসছিল সাধারণ শিক্ষার্থীরা। এই ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে ১৮ জুলাই সকালে চট্টগ্রামের শাহ আমানত সেতু চত্বরে, যেখানে সাধারণ শিক্ষার্থী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে টানা কয়েক ঘণ্টার রক্তক্ষয়ী সংঘাতে পুরো এলাকা এক ভয়াবহ রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।
সকাল থেকেই থমথমে চট্টগ্রাম ও বিজিবির টহল যমুনা টিভির সরাসরি সম্প্রচারিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, এদিন সকাল থেকেই চট্টগ্রামের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিপুল উপস্থিতি ছিল। পুলিশ, ডিবি পুলিশের পাশাপাশি আট প্লাটুন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এবং রায়ট কার সকাল থেকেই শহরের বিভিন্ন সড়কে টহল দিচ্ছিল। গণপরিবহনের সংখ্যা ছিল অন্য যেকোনো দিনের চেয়ে অনেক কম এবং মানুষের মধ্যে কাজ করছিল এক চাপা আতঙ্ক।
শাহ আমানত সেতু চত্বরে জমায়েত ও পুলিশের ক্র্যাকডাউন পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী, সকাল ১০টায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম কলেজ, মহসীন কলেজ, সিটি কলেজসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষার্থীরা শাহ আমানত সেতু চত্বরে জমায়েত হতে শুরু করেন।
সকাল সাড়ে ১০টার দিকে পুলিশের সাথে শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষ শুরু হয়। পুলিশ শিক্ষার্থীদের জমায়েত লক্ষ্য করে অতর্কিতে মুহুর্মুহু টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করতে থাকে। এর জবাবে সাধারণ শিক্ষার্থীরাও ইটপাটকেল ছুড়ে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। শুরু হয় দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া।
রণক্ষেত্র চত্বর ও পুলিশের গণগ্রেপ্তার টানা পৌনে এক ঘণ্টা ধরে চলা এই সংঘর্ষে পুরো শাহ আমানত সেতু ও আশপাশের এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। টিয়ারশেলের বিষাক্ত ধোঁয়ায় চারপাশ আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। পুলিশ শিক্ষার্থীদের ছত্রভঙ্গ করতে করতে একেবারে সামনের দিকে এগিয়ে যায় এবং বেশ কিছু শিক্ষার্থীকে আটক করে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম সিটি কলেজের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী নাজমুল হোসেনসহ বেশ কয়েকজনকে ঘটনাস্থল থেকে আটক করে পুলিশ।
রাস্তায় ব্যারিকেড ও অবরুদ্ধ যান চলাচল পুলিশের এই ক্র্যাকডাউনের মুখে শিক্ষার্থীরা আশপাশের অলিগলিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে যান। তারা সড়কগুলোতে কাঠ, বাঁশ, লোহা ও অন্যান্য জিনিসপত্র দিয়ে ব্যারিকেড তৈরি করেন। এর ফলে চট্টগ্রাম-কক্সবাজারমুখী সড়কসহ আশপাশের সব সড়কে যান চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় এবং চরম দুর্ভোগে পড়েন যাত্রীরা। পরবর্তীতে বিজিবি সদস্যরা এসে রাস্তা থেকে সেই ব্যারিকেডগুলো সরিয়ে ফেলার চেষ্টা করেন।
উপসংহার ১৮ জুলাই শাহ আমানত সেতু চত্বরে চট্টগ্রামের সাধারণ শিক্ষার্থীদের এই অকুতোভয় অবস্থান প্রমাণ করেছিল যে, এর আগের দিনের প্রাণহানি বা পুলিশের বিপুল উপস্থিতি কোনো কিছুই আর এই প্রজন্মকে রাজপথ থেকে ফেরাতে পারবে না। টিয়ারশেলের ধোঁয়া ও বিজিবির সাঁজোয়া যানের সামনে দাঁড়িয়ে সেদিন তারা যে প্রতিরোধের গল্প লিখেছিলেন, তা-ই মূলত পরবর্তীতে গণঅভ্যুত্থানের চূড়ান্ত বিজয়ের ভিত গড়ে দিয়েছিল।
Comments (0)
Login to leave a comment.
No comments yet. Be the first to comment.
Related posts
জুলাই আন্দোলন
‘রাতে রাজাকার তকমা, দুপুরে রক্তপাত’: ১৫ জুলাইয়ের সেই দুঃসহ স্মৃতি এবং ছাত্র আন্দোলন থেকে গণ-আন্দোলনে রূপ নেওয়ার ইতিহাস
জুলাই আন্দোলন
কাউকে দেখামাত্র গুলি করা হবে’: ২০ জুলাইয়ের কঠোর কারফিউ এবং বুলেটের ভয়কে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তারুণ্যের সেই রাজপথ দখল
জুলাই আন্দোলন