হাসপাতাল থেকে তুলে নিয়ে রিমান্ড, আর দেশজুড়ে ব্লক রেইড: ২৬ জুলাইয়ের বিভীষিকা
ঢাকা — ২৪ এর জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের দিনলিপিতে ২৬ জুলাই (শুক্রবার) ছিল আরেক উত্তাল দিন। একদিকে কারফিউ, ব্লক রেইড, আর চিরুনি অভিযানের নামে হাজার হাজার সাধারণ শিক্ষার্থী ও মানুষকে গ্রেপ্তার; অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্ত মেট্রোরেল দেখতে গিয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কান্না এবং তা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘নাটক কম করো প্রিয়’ মিমের ঝড়—সব মিলিয়ে এক মিশ্র পরিস্থিতির সাক্ষী হয়েছিল বাংলাদেশ।
চিরুনি অভিযান ও ব্লক রেইড ২৬ জুলাই দেশের বিভিন্ন স্থানে কারফিউ অব্যাহত ছিল। পাশাপাশি কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সহিংসতার ঘটনায় জড়িতদের ধরতে সারা দেশে ‘ব্লক রেইড’ ও ‘চিরুনি অভিযান’ জোরদার করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ঘোষণা দেন, প্রকৃত দোষীদের খুঁজে বের না করা পর্যন্ত এই চিরুনি অভিযান চলবে। এদিন পর্যন্ত সারা দেশে ছাত্র-জনতার নামে ৫৫০টিরও বেশি মামলা দায়ের করা হয় এবং অন্তত ৭ হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়।
সমন্বয়কদের তুলে নেওয়া ও নির্যাতন ২৬ জুলাই গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতাল থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের তিন সমন্বয়ক—নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ এবং আবু বাকের মজুমদারকে তুলে নিয়ে যায় গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। পরবর্তীতে নাহিদ ইসলাম জানান, ডিবি হেফাজতে তাদের ওপর মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন (মেন্টাল টর্চার) চালানো হয়েছিল এবং আন্দোলন বন্ধ করতে প্রতিনিয়ত ভয়ভীতি দেখানো হয়েছিল।
মেট্রোরেলে হাসিনার কান্না ও ‘নাটক কম করো প্রিয়’ এর আগের দিন (২৫ জুলাই) ক্ষতিগ্রস্ত মিরপুর-১০ নম্বর মেট্রোরেল স্টেশন পরিদর্শনে গিয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ধ্বংসযজ্ঞ দেখে আফসোস করেন এবং চোখের পানি ফেলেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, "যেটা মানুষের জীবনযাত্রা সহজ করে, তা ভেঙে নষ্ট করে দেওয়ার কী মানসিকতা?"
তবে শত শত ছাত্র-জনতা হত্যার পর মৃত্যুর বিচার না করে মেট্রোরেলের কাচ ও পিলারের জন্য শেখ হাসিনার এই কান্না সাধারণ মানুষের মনে চরম ক্ষোভের জন্ম দেয়। ২৬ জুলাই ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেখ হাসিনার কান্নারত ছবি দিয়ে বানানো মিম ভাইরাল হয়ে যায়, যার ক্যাপশন ছিল—"নাটক কম করো প্রিয়।"
র্যাবের দাবি ও রাজনৈতিক পাল্টাপাল্টি বক্তব্য আন্দোলনে হেলিকপ্টার থেকে সরাসরি গুলি করার অভিযোগ নাকচ করে দেয় র্যাব। ২৬ জুলাই সংবাদ সম্মেলন করে র্যাব দাবি করে, তারা কোনো মারণাস্ত্র ব্যবহার করেনি, বরং হেলিকপ্টার থেকে শুধু টিয়ারশেল এবং সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়েছে।
অন্যদিকে, তৎকালীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের চলমান সহিংসতার পুরো দায় জামায়াত-শিবির ও বিএনপির ওপর চাপান। তিনি দাবি করেন, আন্দোলনকারীদের ওপর ভর করে বিএনপি-জামায়াত রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে ক্ষমতা দখল করতে চাইছে। এর জবাবে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অভিযোগ করেন, বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের নির্বিচারে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে এবং ব্রিটিশ, পাকিস্তান এমনকি এরশাদের আমলেও এমন নির্বিচার হত্যাকাণ্ড হয়নি।
অর্থনীতি ও অন্যান্য খাতে প্রভাব টানা ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট ও কারফিউর কারণে দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করে। তৈরি পোশাক রপ্তানি মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয় এবং বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা কমতে থাকে। এছাড়াও, জুলাই মাসের এক সপ্তাহে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স অর্ধেকের নিচে নেমে আসে। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে এইচএসসি ও সমমানের বেশ কয়েকটি পরীক্ষাও স্থগিত ঘোষণা করে আন্তঃশিক্ষা বোর্ড।
Comments (0)
Login to leave a comment.
No comments yet. Be the first to comment.
Related posts
জুলাই আন্দোলন
‘রাতে রাজাকার তকমা, দুপুরে রক্তপাত’: ১৫ জুলাইয়ের সেই দুঃসহ স্মৃতি এবং ছাত্র আন্দোলন থেকে গণ-আন্দোলনে রূপ নেওয়ার ইতিহাস
জুলাই আন্দোলন
কাউকে দেখামাত্র গুলি করা হবে’: ২০ জুলাইয়ের কঠোর কারফিউ এবং বুলেটের ভয়কে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তারুণ্যের সেই রাজপথ দখল
জুলাই আন্দোলন