‘আপনি কি ৫৬% কোটার পক্ষে না বিপক্ষে?’: পুলিশের বিবেকের কাঠগড়ায় অকুতোভয় শিক্ষার্থী
চট্টগ্রাম — "আমি আপনাকে একটা প্রশ্ন করছি, আপনি কি বাংলাদেশের ৫৬% কোটার পক্ষে নাকি বিপক্ষে? হ্যাঁ অথবা না—ক্লিয়ার আনসার দেন। যদি বিপক্ষে থাকেন, সাধারণ শিক্ষার্থীদের পক্ষে থাকেন, তবে আমাদের যেতে দিন!"
২০২৪ সালের ১১ জুলাই। কোটা সংস্কার আন্দোলন তখনো সরকার পতনের এক দফায় রূপ নেয়নি। কিন্তু শিক্ষার্থীদের ভেতরে বঞ্চনার যে আগ্নেয়গিরি তৈরি হয়েছিল, তা সেদিন এভাবেই লাভা হয়ে বেরিয়ে এসেছিল চট্টগ্রামের রাজপথে। ভারী অস্ত্র ও লাঠিসোঁটা হাতে দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশের চোখের দিকে চোখ রেখে এক সাধারণ শিক্ষার্থীর এমন ভয়ডরহীন প্রশ্ন সেদিন কাঁপিয়ে দিয়েছিল পুরো সমাজযন্ত্রকে।
মনস্তাত্ত্বিক লড়াই ও ব্যারিকেড ভাঙার গল্প চ্যানেল ২৪-এর ফুটেজে দেখা যায়, পুলিশের ব্যারিকেডের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা শিক্ষার্থীরা কোনোভাবেই পিছু হটতে রাজি নন। তারা স্পষ্ট জানিয়ে দেন, "দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমরা রাজপথ ছাড়ব না।" শুধু শারীরিক প্রতিরোধ নয়, সেদিন পুলিশের বিবেকের কাছেও সরাসরি প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছিলেন শিক্ষার্থীরা। তারা পুলিশকে বোঝানোর চেষ্টা করেন যে এই আন্দোলন জনগণের স্বার্থে। শেষ পর্যন্ত পুলিশের বাধা ও ধাক্কাধাক্কি উপেক্ষা করে বুক চিতিয়ে ব্যারিকেড ভেঙে নিজেদের মিছিল নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যান অকুতোভয় শিক্ষার্থীরা।
২ নম্বর গেট রণক্ষেত্র: বুক চিতিয়ে দাঁড়াল তারুণ্য সেদিন চট্টগ্রামের ২ নম্বর গেট এলাকায় শিক্ষার্থীদের মিছিলটি শুরুর দিকে অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ ছিল। কিন্তু মিছিলটি ওই এলাকায় পৌঁছাতেই পুলিশ অতর্কিত বাধা দেয় এবং শুরু হয় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া।
মুহূর্তের মধ্যেই পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। পুলিশের লাঠিচার্জ ও ধাওয়ার মুখে অন্য সময় মানুষ ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলেও, সেদিনের দৃশ্যপট ছিল ভিন্ন। এক শিক্ষার্থী নিজের জীবনের পরোয়া না করে বুক চিতিয়ে সরাসরি পুলিশের সামনে দাঁড়িয়ে যান। পুলিশের হামলায় তিনি রাজপথে লুটিয়ে পড়েন এবং আহত হন। সহপাঠীরা ছুটে এসে তাকে পানি পান করান এবং উদ্ধার করে নিয়ে যান।
‘পুলিশ দিয়ে আন্দোলন বন্ধ করা যাবে না’ আহত সহযোদ্ধাকে দেখে সেদিন দমে যাননি চট্টগ্রামের শিক্ষার্থীরা। বরং তাদের স্লোগানের মাত্রা আরও তীব্র হয়। ২ নম্বর গেট এলাকা প্রকম্পিত হতে থাকে তাদের আকাশভেদী স্লোগানে—"আপস না সংগ্রাম? সংগ্রাম, সংগ্রাম!", "দালালি না রাজপথ? রাজপথ, রাজপথ!", "পুলিশ দিয়ে আন্দোলন বন্ধ করা যাবে না!"
উপসংহার জুলাই বিপ্লবের ইতিহাসে ১১ জুলাই চট্টগ্রামের এই ঘটনাটি একটি বড় টার্নিং পয়েন্ট। সেদিন শিক্ষার্থীরা শুধু পুলিশের লাঠিই বুক পেতে নেননি, বরং রাষ্ট্রযন্ত্রের অন্যায্য কাঠামোর চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিলেন যে, মেধা ও ন্যায়ের প্রশ্নে এই প্রজন্ম কোনো আপস করতে রাজি নয়। সেদিন চট্টগ্রামের রাজপথে যে নির্ভীক প্রতিরোধের বীজ বোনা হয়েছিল, তা-ই পরবর্তীতে ৫ আগস্টের চূড়ান্ত বিজয়ের মহীরুহে পরিণত হয়।
Comments (0)
Login to leave a comment.
No comments yet. Be the first to comment.
Related posts
জুলাই আন্দোলন
‘রাতে রাজাকার তকমা, দুপুরে রক্তপাত’: ১৫ জুলাইয়ের সেই দুঃসহ স্মৃতি এবং ছাত্র আন্দোলন থেকে গণ-আন্দোলনে রূপ নেওয়ার ইতিহাস
জুলাই আন্দোলন
কাউকে দেখামাত্র গুলি করা হবে’: ২০ জুলাইয়ের কঠোর কারফিউ এবং বুলেটের ভয়কে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তারুণ্যের সেই রাজপথ দখল
জুলাই আন্দোলন