১৮ জুলাই: রাজপথে বুলেটের খোসা আর ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন সিলেট নগরী
সিলেট — "আপনিও কোনো না কোনো মায়ের সন্তান, আমিও কোনো না কোনো মায়ের সন্তান। সুতরাং একজন ছাত্রের গায়ে যখন আপনি হাত তুলবেন, তখন কি আপনার গায়ে একটুও কাঁপে না?"
২০২৪ সালের ১৮ জুলাই। কোটা সংস্কার আন্দোলন তখন ধীরে ধীরে এক গণজাগরণের রূপ নিচ্ছে। ওই দিন সিলেটের রাজপথে পুলিশের সাঁজোয়া যান আর ভারী অস্ত্রের সামনে দাঁড়িয়ে এক নিরস্ত্র শিক্ষার্থী ঠিক এভাবেই আবেগঘন কণ্ঠে প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু স্বৈরাচারী সরকারের নির্দেশে অন্ধ হয়ে থাকা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সেই আর্তনাদ শোনেনি; বরং জবাব দিয়েছিল টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড আর শটগানের ছররা গুলিতে। মুহূর্তেই পুরো সিলেট নগরী পরিণত হয়েছিল এক ভয়াবহ রণক্ষেত্রে।
আবেগঘন মুহূর্ত ও পুলিশের অতর্কিত ক্র্যাকডাউন যমুনা টিভির ধারণ করা সেদিনের একটি ঐতিহাসিক ফুটেজে দেখা যায়, সিলেটের রাজপথে শিক্ষার্থীরা শুরুতে পুলিশের সাথে কথা বলে পরিস্থিতি শান্ত রাখার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু শিক্ষার্থীদের সেই যৌক্তিক কথার কোনো তোয়াক্কা না করে পুলিশ হঠাৎ করেই সাঁড়াশি আক্রমণ শুরু করে।
রাস্তায় নামানো হয় পুলিশের বিশেষায়িত সাঁজোয়া যান (এপিসি)। এপিসি থেকে এবং পুলিশের বন্দুক থেকে বৃষ্টির মতো টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ছোড়া হতে থাকে। বিকট শব্দে এবং টিয়ারগ্যাসের বিষাক্ত ধোঁয়ায় চারপাশ আচ্ছন্ন হয়ে যায়।
দফায় দফায় সংঘর্ষ ও ছাত্র-জনতার প্রতিরোধ অত্যাধুনিক অস্ত্র ও রায়ট গিয়ারে সজ্জিত পুলিশের এই বর্বরোচিত ক্র্যাকডাউনের মুখেও সেদিন সিলেটের ছাত্র-জনতা রাজপথ ছেড়ে পালিয়ে যায়নি। বরং তারা রাস্তায় টায়ার জ্বালিয়ে, ইট-কাঠ দিয়ে ব্যারিকেড তৈরি করে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। শুরু হয় দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপ।
ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, পুলিশের মুহুর্মুহু টিয়ারশেলের ধোঁয়ার ভেতর দিয়ে লাঠি হাতে বেরিয়ে আসছেন ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা। খালি গায়ে, চোখেমুখে ক্ষোভ নিয়ে তারা পুলিশের সাঁজোয়া যানের দিকে ইটপাটকেল ছুড়ছেন। একপর্যায়ে সিলেটের রাজপথ ছেয়ে যায় পুলিশের ছোড়া শটগানের রঙিন কার্তুজের খোসায়, যা সেদিনের ভয়াবহতার এক নীরব সাক্ষী হয়ে আছে।
উপসংহার ১৮ জুলাইয়ের এই দিনটি পুরো বাংলাদেশের পাশাপাশি সিলেটের ইতিহাসেও এক কালো অথচ বীরত্বপূর্ণ দিন হিসেবে লেখা থাকবে। সেদিন সিলেট নগরীর অলিগলিতে পুলিশের এই মাত্রাতিরিক্ত বলপ্রয়োগ এবং এর বিপরীতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের খালি হাতের প্রতিরোধ প্রমাণ করেছিল যে, বুলেটের ভয় দেখিয়ে আর এই প্রজন্মকে দাবিয়ে রাখা যাবে না। সিলেটের সেই রাজপথের আগুনই পরবর্তীতে ছড়িয়ে পড়েছিল ৫ আগস্টের চূড়ান্ত বিজয়ের পথে।
Comments (0)
Login to leave a comment.
No comments yet. Be the first to comment.
Related posts
জুলাই আন্দোলন
‘রাতে রাজাকার তকমা, দুপুরে রক্তপাত’: ১৫ জুলাইয়ের সেই দুঃসহ স্মৃতি এবং ছাত্র আন্দোলন থেকে গণ-আন্দোলনে রূপ নেওয়ার ইতিহাস
জুলাই আন্দোলন
কাউকে দেখামাত্র গুলি করা হবে’: ২০ জুলাইয়ের কঠোর কারফিউ এবং বুলেটের ভয়কে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তারুণ্যের সেই রাজপথ দখল
জুলাই আন্দোলন