১১ জুলাই: শাহবাগে যেভাবে পুলিশের দম্ভ চূর্ণ করে ‘বাংলা ব্লকেড’ সফল করেছিল ছাত্র-জনতা
ঢাকা — "আজকে একটি প্রাণীও যেন ব্যারিকেড ভেঙে সামনের দিকে এগোতে না পারে"—২০২৪ সালের ১১ জুলাই শাহবাগ মোড়ে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ঠেকাতে ঠিক এমনই কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছিল পুলিশ। জলকামান, সাঁজোয়া যান (এপিসি) আর রায়ট গিয়ারে সজ্জিত শত শত পুলিশ সদস্য শাহবাগের চারপাশ ঘিরে ডাবল ব্যারিকেড তৈরি করেছিল। কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্রের এই বিশাল প্রস্তুতি আর দম্ভ মুহূর্তের মধ্যেই ধূলিসাৎ হয়ে যায় হাজারো তারুণ্যের অকুতোভয় সাহসের সামনে।
‘ভুয়া ভুয়া’ স্লোগান ও ব্যারিকেড পতন সেদিন বিকেল সাড়ে ৩টার পর থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ আশপাশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের হাজার হাজার শিক্ষার্থী ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচি সফল করতে পাবলিক লাইব্রেরির সামনে দিয়ে শাহবাগের দিকে এগোতে থাকেন। পুলিশের মুখোমুখি আসতেই পরিস্থিতি চরম উত্তেজনাকর হয়ে ওঠে।
পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা মাইকিং করে শিক্ষার্থীদের সরে যাওয়ার অনুরোধ করলেও, শিক্ষার্থীরা তাদের দাবিতে অনড় থাকেন। একপর্যায়ে হাজারো শিক্ষার্থী আকাশভেদী ‘ভুয়া ভুয়া’ স্লোগান দিয়ে পুলিশের প্রথম ব্যারিকেডটি ভেঙে ফেলেন। মুহূর্তের মধ্যেই শাহবাগ মোড় যেন তারুণ্যের এক বিশাল জনসমুদ্রে পরিণত হয়।
জলকামান ও সাঁজোয়া যান দখল ব্যারিকেড ভাঙার পর পুলিশের জলকামান ও সাঁজোয়া যানের দিকে ধেয়ে যান বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা। ভয়ডরহীন তরুণরা সোজা উঠে পড়েন পুলিশের সাঁজোয়া যান ও জলকামানের ওপর। ফুটেজে দেখা যায়, এক অকুতোভয় শিক্ষার্থী জলকামানের একেবারে ওপরে দাঁড়িয়ে বীরদর্পে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা ওড়াচ্ছেন। চারপাশের হাজারো শিক্ষার্থীর ‘ভুয়া ভুয়া’ স্লোগানে তখন পুরো শাহবাগ এলাকা প্রকম্পিত।
নেতৃত্বের দূরদর্শিতা ও অহিংস প্রতিরোধ তবে সবচেয়ে নজরকাড়া বিষয় ছিল সেদিনের নেতৃত্ব। বিক্ষুব্ধ কিছু শিক্ষার্থী যখন পুলিশের গাড়ির ওপর চড়াও হচ্ছিলেন, তখন সারজিস আলম ও মহিউদ্দিন রনিসহ অন্যতম সমন্বয়ক এবং নেতারা গাড়ির ওপর উঠে সাধারণ শিক্ষার্থীদের শান্ত করার চেষ্টা করেন। তারা অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে মাইকিং করে ঘোষণা দেন, "পুলিশের কোনো গাড়ির যেন বিন্দুমাত্র ক্ষতি না হয়।"
তাদের নির্দেশনায় শিক্ষার্থীরা কোনো প্রকার ভাঙচুর ছাড়াই সম্পূর্ণ অহিংস উপায়ে পুলিশের সাঁজোয়া যান ও জলকামানগুলোকে পিছু হঠতে বাধ্য করেন। শিক্ষার্থীদের স্লোগান ও চাপের মুখে পুলিশ তাদের যানগুলো নিয়ে সোনারগাঁও মোড়ের দিকে পিছু হঠে।
সফল বাংলা ব্লকেড পুলিশকে পিছু হঠিয়ে শিক্ষার্থীরা শাহবাগ মোড়ের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেন। পুলিশের ফেলে যাওয়া ব্যারিকেডগুলো দিয়েই তারা নিজেদের মতো করে নতুন ব্যারিকেড তৈরি করেন এবং অত্যন্ত শৃঙ্খলার সাথে অ্যাম্বুলেন্সসহ জরুরি যান চলাচলের পথ খোলা রেখে নিজেদের ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচি পালন করেন।
উপসংহার ১১ জুলাই শাহবাগের এই ঘটনাটি ছিল মূলত সাধারণ শিক্ষার্থীদের এক বিরাট মনস্তাত্ত্বিক বিজয়। রাষ্ট্রের বিপুল শক্তি ও সাঁজোয়া যানের সামনে খালি হাতে দাঁড়িয়ে যেভাবে তারা সেদিন ব্যারিকেড ভেঙেছিলেন, তা প্রমাণ করেছিল—এই প্রজন্মকে আর ভয় দেখিয়ে আটকে রাখা যাবে না। শাহবাগের এই অকুতোভয় প্রতিরোধই মূলত ৫ আগস্টের চূড়ান্ত গণঅভ্যুত্থানের ভিত মজবুত করেছিল।
Comments (0)
Login to leave a comment.
No comments yet. Be the first to comment.
Related posts
জুলাই আন্দোলন
‘রাতে রাজাকার তকমা, দুপুরে রক্তপাত’: ১৫ জুলাইয়ের সেই দুঃসহ স্মৃতি এবং ছাত্র আন্দোলন থেকে গণ-আন্দোলনে রূপ নেওয়ার ইতিহাস
জুলাই আন্দোলন
কাউকে দেখামাত্র গুলি করা হবে’: ২০ জুলাইয়ের কঠোর কারফিউ এবং বুলেটের ভয়কে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তারুণ্যের সেই রাজপথ দখল
জুলাই আন্দোলন